বাংলাদেশে একসময় গবেষণা কিংবা সরকারি নীতিমালা আলোচনার ক্ষেত্রে কৃষি ও খাদ্য গুরুত্ব পেত। আশির দশকের পর থেকে কোনো ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে না। ভোক্তারা যৌক্তিক দামে পণ্য পাচ্ছেন না, আবার উৎপাদকও যৌক্তিক দাম পাচ্ছেন না। তাছাড়া নিরাপদ খাদ্যপণ্য কতটা আমদানি কিংবা তৈরি হচ্ছে, সেটাও বিবেচনা করা দরকার। কারণ ক্যান্সার হাসপাতালে রোগীর একটা বড় অংশই কৃষক। এর মানে খাদ্যপণ্য উৎপাদনে এমন অনেক উপাদান ব্যবহার হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কৃষকরা। যারা আবার ঠিকমতো দামও পাচ্ছে না।
মুক্তবাজার অর্থনীতির সাধারণ ধরন হচ্ছে অনেক প্রতিযোগী ও ক্রেতা-বিক্রেতা থাকবে এবং সব তথ্য সবার কাছে থাকবে। বাস্তবে মুক্তবাজার অর্থনীতি একটি কল্পকথা—এর কোনো অস্তিত্ব নেই। যেটার অস্তিত্ব আছে, সেটা অলিগোপলি। বেশির ভাগ বাজার ও পণ্য উৎপাদন কতিপয় গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। ফলে মুক্তবাজারের মূল ধারণাগুলো এখানে কাজ করবে না। এখানে প্রতিযোগিতা কমিশন ও সরকারের ভূমিকা আছে।
গত দেড় দশকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে ভয়ংকর অবনতি হয়েছে। আমাদের বিবিএস—ঠিকমতো কাজ করে না, মন্ত্রণালয়গুলোও নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে পারে না। সব প্রতিষ্ঠান নির্ভরশীল ছিল ওপরের আদেশের। সবকিছু একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক চললে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বা শক্তি-উদ্যোগ কাজ করে না। এমনকি আদালতও ওপরের আদেশ অনুযায়ী চলে। সেটা গত দেড় দশকে সবচেয়ে ভয়ংকর আকার ধারণ করেছিল। এখান থেকে বের হওয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গত সরকারের সময় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। এটা স্বীকৃত ছিল যে কৃষকের পর থেকে প্রত্যেকটা স্তরে চাঁদাবাজির সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছিল। লুটপাট এবং চাঁদাবাজি অনির্দিষ্ট ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়েছে। এর কারণ কোথাও কোনো ধরনের জবাবদিহি ছিল না। সেই সরকার পতনের পরও দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখানে চাঁদাবাজির নতুন নতুন ধরন হয়েছে। কিন্তু চাঁদাবাজি ছাড়াও মুক্তবাজারের পরিবর্তে কতিপয় গোষ্ঠীর হাতে মূল্যবৃদ্ধির কৌশলটা অব্যাহত রয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পুরো জ্বালানি খাতের নীতিমালার ভূমিকা আছে। নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে পুরো অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে আঘাত করা হয়েছে। এ ঘটনা অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে। চিনিসহ বেশ কয়েকটা পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। পণ্যটি একচেটিয়াভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে গেছে—বিপরীতে আমাদের চিনিকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ এগুলো বন্ধ করার কোনো কার্যকর কারণ ছিল না। চিনিকলগুলো বন্ধ না হলে চিনির বাজারে প্রতিযোগিতা থাকত, আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমত এবং কম দামে তুলনামূলক ভালো গুণগত চিনি পেতাম।
আইএমএফের শর্তের কারণে যে ভ্যাট বাড়ল, সেটা ব্যবসা ও উৎপাদনশীলতা—সবক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। সরকারের যুক্তি হচ্ছে, আইএমএফ থেকে ঋণ না নিলে অর্থনীতির ঘাটতি মেটানো যাবে না। আইএমএফ থেকে তিন বছরে সরকার যে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিচ্ছে, সে একই পরিমাণ অর্থ আমরা রেমিট্যান্স থেকে দুই মাসেই পাই। প্রতি বছরে আমাদের রফতানি আয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে তিন বছরে আইএমএফের কাছ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার নেয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে, সেটার কোনো যুক্তি নেই। এ অযৌক্তিক সিদ্ধান্তগুলো অর্থনীতিতে ব্যয়বৃদ্ধির চাপ তৈরি করে। এসব শর্ত পূরণ করতে গিয়ে আমাদের উৎপানশীলতা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে, অর্থনীতি ব্যয়বহুল হচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বেসরকারীকরণ ও পণ্যের দাম বাড়ানোর পুরনো যে নীতির কারণে গত সরকারের আমলে লুণ্ঠনকারী, ঋণখেলাপি ও দখলদারের আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, একই ধরনের নীতিমালা এখনো অব্যাহত থাকলে কিছু পরিবর্তন হবে না। জিনিসপত্রের দামে কৃষক ও ভোক্তা—উভয়েই বঞ্চিত হতে থাকবেন।
অন্তর্বর্তী সরকার খুব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে না। তাদের পক্ষে মৌলিক পরিবর্তন করার সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু তারা তো পরিবর্তনের কিছু ভিত্তি স্থাপন, দৃশ্যমান লক্ষ্য ও উদ্যোগ তৈরি করতে পারে। সরকারের দিক থেকে অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা ও বাজারে প্রভাব রাখার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্যোগ নেয়া দরকার। পাশাপাশি কৃষিখাদ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ কিংবা কমিশন গঠন করা যেতে পারে।